আইএফআইসি ব্যাংকের সঙ্গে ১ কোটি পরিবার যুক্ত হবে

Date: November 6, 2023

Source: Prothomalo

 

দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত এবং পুঁজিবাজার নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ার। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি ফখরুল ইসলাম।

আইএফআইসি ব্যাংক কোন কোন বিষয়ে জোর দিয়ে থাকে?

শাহ আলম সারওয়ার: একটা ব্যাংককে টেকসই অবস্থায় পৌঁছাতে গেলে অর্থনীতির মূল স্রোতের সঙ্গে সংযোগ থাকতে হয়। দেশে যে মেট্রোপলিটন শহরগুলো আছে, তার বাইরেও একটা জগৎ আছে। ওই জগৎটা সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে, সবচেয়ে বেশি বসবাসের জায়গা তৈরি করছে। ওই জায়গাটার সঙ্গে আমরা যোগাযোগ স্থাপন করতে চাই। আমরা মনে করি, এর মাধ্যমে একটা শক্তিশালী ভিত্তি পাব এবং এগিয়ে যেতে পারব, যদিও বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা বলা সহজ হলেও করা কঠিন।

কীভাবে কঠিন?

শাহ আলম সারওয়ার: আপনি যদি অস্ট্রেলিয়ার কৃষি খাতকে সমর্থন দিতে চান, ওখানকার একজন কৃষকের কৃষিভূমির আকার হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ বর্গমাইল। আমাদের এখানে কিন্তু ভিন্ন চিত্র। একজনের কাছে অনেক টাকা আছে, সে ধরনের লোকের সংখ্যা এখানে কম। আর এ ধরনের লোক যাঁরা আছেন, তাঁদের পেছনে ৬০টা ব্যাংক আমরা দৌড়াচ্ছি। অথচ আমাদের অধিকাংশ মানুষের হাতে অল্প টাকা আছে। আমাদের চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে, সমাজের খণ্ডিত অংশ থেকে ওই অল্প অল্প সঞ্চয় জোগাড় করে সেটা আবার তাঁদের কাছেই ঋণ আকারে দেওয়া। এ কাজটা করার খরচ আছে ভালোই। তবে আইএফআইসি ব্যাংক প্রায় ১০ বছর পরিশ্রম করে প্রযুক্তি ও যথাযথ বিতরণব্যবস্থার মাধ্যমে একটা উপায় বের করেছে। মানবসম্পদের উৎপাদনশীলতাও বাড়ানো হয়েছে। এতে খরচ গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে এসেছে। ফলে এজেন্ট বা কারও মাধ্যমে না গিয়ে সরাসরি ১ হাজার ৪০০–এর কাছাকাছি শাখা-উপশাখা খুলে ফেলেছি, শাখা আছে প্রায় ২০০, বাকিগুলো উপশাখা। একেকটা উপশাখায় দুজন কাজ করেন।

এ উপশাখা কি এজেন্ট ব্যাংক?

শাহ আলম সারওয়ার: না। উপশাখাগুলোও সরাসরি ব্যাংকিং কার্যক্রমে যুক্ত। শাখা যদি গ্রহ হয়, উপশাখা উপগ্রহ। একটা সাধারণ শাখা যে সেবা দেয়, উপশাখাও একই সেবা দেয়। আমি গ্রামে বা সাধারণ মানুষের কাছে যাব, ছোট ছোট আমানত আনব, ছোট ছোট ঋণ দেব। আমার প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে খরচ আর দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করে ঋণ দেওয়া হচ্ছে কি না। আমরা কয়েক দিন আগে তেঁতুলিয়ায় শাখা খুলেছি। তেঁতুলিয়ার ছেলে বা মেয়েটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে কি না, সেই নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে। এজেন্ট বা অন্য কোনো মাধ্যমের ওপর নির্ভর করলে সেই নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। প্রযুক্তির ব্যবহার, বিতরণ ও কম খরচের পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে একটা মডেল দাঁড় করিয়েছি। আর এ মডেলের মাধ্যমেই আমরা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছি।

ছড়িয়ে পড়ে কী সুবিধা আনলেন, একটু বলবেন?

শাহ আলম সারওয়ার: একটা একটা করে যদি বলি, আইএফআইসির গৃহঋণই হচ্ছে মোট ঋণের ২২ শতাংশ। গ্রামেগঞ্জে সেমিপাকা বাড়ি করার জন্য ঋণ দিচ্ছি। ‘আমার অ্যাকাউন্ট’ নামে একটা পণ্য তৈরি করেছি। এর মাধ্যমে আমরা মোট আমানতের ২৬ শতাংশ সংগ্রহ করছি।

গৃহঋণ চালু করলেন কোন বিষয়টি মাথায় রেখে?

শাহ আলম সারওয়ার: আমার পুরো গেম প্ল্যানই তো এটা। পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, শুধু শহরের মধ্যে গৃহঋণ দিলে তার খেলাপি হার হবে সর্বোচ্চ। কিন্তু আমি যদি লাকসাম বা মধুপুরে বা তেঁতুলিয়ায় সেমিপাকা বাড়ি করার জন্য ১০, ১৫ বা ২৫ লাখ টাকা ঋণ দিই, এর খেলাপি ঋণের হার খুবই নিম্নতম। দেশের ঋণদাতারা কিন্তু অসহায়। কোনো ঋণগ্রহীতা যদি শক্তিশালী হন, তাহলে তিনি মামলা করে ২৫ বছর টেনে নিয়ে যেতে পারেন আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে। এ রকম একজন বড় গ্রাহক যদি টাকা পরিশোধ না করেন বা ব্যর্থ হন, তাহলে আমাদের কিন্তু ৫০০ কোটি টাকা নেই। তা ছাড়া গৃহঋণের বিপরীতে ভালো জামানত থাকায় ঋণ আদায় করা সহজ।

লক্ষ্যটা একটু উচ্চাভিলাষী হয়ে যায় না?

শাহ আলম সারওয়ার: না। কারণ, আইএফআইসির নেটওয়ার্ক এখন অনেক বড়। সোনালি ব্যাংকের শাখা এখন ১ হাজার ২৩৭ আর আমাদের ১ হাজার ৪০০-এর কাছাকাছি। মোটকথা, বড় একটি জনগোষ্ঠীকে ধরে আমি ব্যাংকিং করতে চাই। এ দেশে ১৭ থেকে ১৮ কোটি মানুষের ৪ কোটি পরিবার আছে। আমরা চাই, এক কোটি পরিবার আইএফআইসি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

আমার অ্যাকাউন্ট নিয়ে কী যেন বলছিলেন?

শাহ আলম সারওয়ার: মানুষ কিছু সুদ পাওয়ার আশায় ব্যাংকে টাকা রাখেন। এ ছাড়া যখন খুশি টাকা জমা দেব, তুলব—এটাও একটা কারণ। সেই সঙ্গে ঘরে বসে অ্যাপের মাধ্যমে টাকা তুলতে চান গ্রাহক। মাসের শেষ দিকে টাকার প্রয়োজন হলে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে নামমাত্র সুদে কিছু (ঋণ) তুলে আবার নতুন মাসে তা শোধ দিলেন। এসব কিছু মিলিয়ে ‘আমার অ্যাকাউন্ট’ নামের সেবা তৈরি করেছি।

আর কী কী ভালো পণ্য রয়েছে?

শাহ আলম সারওয়ার: গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে যাঁরা মাসে ৫০০, ১০০০ বা ২০০০ টাকা জমাতে চান, তাঁদের জন্য ‘সহজ’ নামে একটি আমানত পণ্য চালু করেছি। ফলে টাকা ঘরে না রেখে ব্যাংকে রাখতে পারছেন তাঁরা। আবার এই জনগোষ্ঠীর জন্যই ‘সহজ ঋণ’ নামে একটি পণ্য চালু করেছি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে যেসব কার্যক্রম আছে, সেগুলোর উন্নয়নের জন্য ‘সুবর্ণগ্রাম’ নামে একটা পণ্য রয়েছে আমাদের। শহরে দুই থেকে তিন মাইল, আর গ্রামে পাঁচ মাইলের মধ্যে মানুষ যাতে আইএফআইসি ব্যাংককে পায়, সেই পর্যায়ে চলে গেছি আমরা। গ্রামে আমরা একজনকে মাছ চাষের জন্য ১০ কোটি টাকার ঋণ না দিয়ে তা ১০০ জনের মধ্যে বিতরণ করতে চাই। আরেকটা কথা, প্রত্যেক কর্মকর্তাকে আমরা ২৩ ধরনের সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করেছি।

আপনার ব্যাংকের জনবল কত?

শাহ আলম সারওয়ার: প্রায় ৫ হাজার, এর মধ্যে ৩৬ শতাংশ নারী। নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান পার্থক্য করি না। আর সবার জন্যই আমরা একটা পদ্ধতি তৈরি করেছি। প্রধান কার্যালয়ে বসেই দেখা যায় কোন শাখা-উপশাখাতে কী হচ্ছে। একেবারে সপ্তাহের ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা তদারক যেটাকে বলে।

আপনি যে সেবার কথা বললেন, সেই সেবা তো সব ব্যাংকই দেয়। আইএফআইসির তাহলে বিশেষ দিক কোনটি?

শাহ আলম সারওয়ার: ভালো প্রশ্ন। অন্যদের সঙ্গে প্রথম পার্থক্য হচ্ছে, আমরা নিজেদের লোক দিয়ে সব কার্যক্রম পরিচালনা করছি। দ্বিতীয় পার্থক্য হচ্ছে, সত্যিকারের অনলাইন সুবিধা। অন্য সব ব্যাংকই তো অনলাইন সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু আমার ঢাকার একজন গ্রাহক পঞ্চগড় শাখা বা ওখানকার কোনো উপশাখায় গিয়েও গৃহঋণ চাইতে পারবেন, অধিকাংশ ব্যাংকের কাছে এ সুবিধা চাইতে গেলে তারা মানা করবে।

অন্য কোনো ব্যাংকই এ সেবা দিতে পারছে না?

শাহ আলম সারওয়ার: কীভাবে দেবে? সোনালি ব্যাংক ছাড়া তো অন্য কারও সেই নেটওয়ার্কই নেই।

আপনি যে সব বলে দিচ্ছেন, তাতে অন্য ব্যাংকগুলো আপনার ব্যবসা কৌশল জেনে যাচ্ছে না?

শাহ আলম সারোয়ার: মেসির ফুটবল খেলা দেখে কি আমি মেসির মতো ফুটবল খেলতে পারব? মেসি যে মেসি হয়েছে, তার পেছনে কত বছরের প্রস্তুতি আছে? আমাদের প্রস্তুতির পেছনেও ১০ বছরের শ্রম আছে। আরেকটা কথা বলি, প্রযুক্তি আসার পর আঞ্চলিক ধারণাগুলো শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যে দূরত্ব আর আমার ভবনের ১৬ তলা থেকে নিচতলার দূরত্ব এখন একই।

এ মুহূর্তে আপনার ব্যাংকের খেলাপি চিত্র কী?

শাহ আলম সারওয়ার: ৬ শতাংশ।

বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে এ হার তো বেশি। আগে থেকে হয়ে আসছে বলে কি? আর মূল্যস্ফীতি এখন যে পর্যায়ে আছে, মানুষ কেন আপনার ব্যাংকে টাকা রাখবে?

শাহ আলম সারওয়ার: এটা একটা অসহায়ত্বের জায়গা আমাদের। আমি সাক্ষাৎকারের শুরুর দিকেই ধারণা দিয়েছিলাম; টাকা পরিশোধ না করার প্রবণতা আছে একশ্রেণির মানুষের, আছে আইনি জটিলতা। আমি এটুকু বলতে পারি যে ঋণ দিতে আমি অল্পের পরিবর্তে বেশি মানুষের কাছে যাচ্ছি। আবার বেশি মানুষের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহেও মনোযোগ দিয়েছি। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সুদের হার, মুদ্রানীতি ইত্যাদির সম্পর্ক আছে। এ ব্যাপারে আমার হাত নেই এবং কোনো মন্তব্যও করব না। তবে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মিলিয়ে আমানত রাখতে পারছি কি না, সেই জবাবও ভালো দিতে পারবেন নীতিনির্ধারকেরা। তবে খেলার মাঠে আমি আপনাকে সেরাটা দিচ্ছি কি না, সেটা হচ্ছে আমার চূড়ান্ত কথা। সারা দেশে ১৩ হাজার এটিএম বুথ আছে। আমার ডেবিট কার্ড এসব বুথে কাজ করে। ফলে বাড়তি মাসুল ছাড়া ১৩ হাজার বুথই আমার এটিএম বুথ।

আপনি কি গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক আছেন এখনো?

শাহ আলম সারওয়ার: না। সম্প্রতি ছেড়ে দিয়েছি। ৯ থেকে ১০ বছর ছিলাম। এ ফাঁকে ব্যাংকটার সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করে দিয়েছি।

শিল্পের বড় পুঁজি সংগ্রহে গ্রাহক যাবে পুঁজিবাজারে, চলতি মূলধন সংগ্রহে যাবে ব্যাংকে। এর উল্টোচিত্র চলছে দেশে। এ সুযোগ নিয়েই কি ব্যাংকগুলো ভালো মুনাফা করছে? শক্তিশালী একটা পুঁজিবাজার যখন এক সময় হবে, তখন এত মুনাফা করতে পারবেন?

শাহ আলম সারওয়ার: এর চেয়ে বেশি পারব। এটা ঠিক, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া ব্যাংকের কাজ না। একটা শক্তিশালী পুঁজিবাজার হলে ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমবে। আমরা যে মুনাফা করি, এর একটা বিরাট অংশ কিন্তু খেলাপির পেছনে চলে যাচ্ছে। আমরা এখন মূলধন ও ঋণ—দুটিই অর্থায়ন করছি। তখন শুধু ঋণ দেব। আমার খেলাপি পরিস্থিতি কমে যাবে। একজন ব্যাংকার হিসেবে আমি তাই সব সময় একটা দক্ষ পুঁজিবাজারকে স্বাগত জানাই।

সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

শাহ আলম সারওয়ার: আপনাকেও ধন্যবাদ।